সালামের পর কেন আমল করবেন
নামাজ শেষে কিছু দোয়া-তাসবিহ পড়া সুন্নত। এগুলো ফরজ নয়, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত পড়তেন এবং সাহাবিদের শিখিয়েছেন। প্রতিটি ওয়াক্তের পরে কমপক্ষে নিচের আমলগুলো করা উত্তম।
১. ইস্তিগফার (৩ বার)
أَسْتَغْفِرُ اللهَ
আস্তাগফিরুল্লাহ। (৩ বার)
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।
সালাম ফেরানোর সাথে সাথে এই ইস্তিগফার পড়া সুন্নত।
২. আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম
اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
আল্লাহুম্মা আনতাস্-সালামু ওয়া মিনকাস্-সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই শান্তি এবং আপনার থেকেই শান্তি আসে। হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী! আপনি বরকতময়।
৩. আয়াতুল কুরসি
প্রতিটি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ — হাদিসে এসেছে যে এটি নিয়মিত পড়লে জান্নাতে প্রবেশে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না।
اللهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তা'খুযুহু সিনাতুও ওয়ালা নাওম, লাহু মা ফিস্-সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ, মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইযনিহ, ইয়া'লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহী ইল্লা বিমা শা'আ, ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস্-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা, ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজীম।
অর্থ: আল্লাহ — তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তিনি জানেন তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে। তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া। তাঁর কুরসি আসমান ও জমিন বেষ্টন করে আছে এবং এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ, মহান। (সূরা বাকারা: ২৫৫)
৪. তাসবিহে ফাতিমি (৩৩-৩৩-৩৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে এই তাসবিহ শিখিয়েছিলেন, তাই একে তাসবিহে ফাতিমি বলা হয়।
سُبْحَانَ اللهِ
সুবহানাল্লাহ। (৩৩ বার)
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র।
الْحَمْدُ لِلَّهِ
আলহামদুলিল্লাহ। (৩৩ বার)
অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
اللهُ أَكْبَرُ
আল্লাহু আকবার। (৩৩ বার)
অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
মোট ৯৯ বার হওয়ার পর ১০০তম বার সম্পূর্ণ করতে নিচের কালিমা একবার পড়া হয়:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সার্বভৌমত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
ফজিলত: হাদিসে এসেছে এই তাসবিহ নিয়মিত পড়লে গুনাহ মাফ হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।
৫. দরুদ শরীফ পড়া
নামাজের পর বেশি বেশি দরুদ পড়া সুন্নত (অধ্যায় ৬-এ সম্পূর্ণ দরুদ দেওয়া আছে)। চাইলে সংক্ষিপ্ত দরুদও পড়া যায়:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلِّمْ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়িদিনা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাহবিহী ওয়াসাল্লিম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের নেতা মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
৬. ব্যক্তিগত দোয়া
তাসবিহ-দরুদ পড়ার পর উভয় হাত তুলে নিজের ভাষায় বা আরবিতে আল্লাহর কাছে যেকোনো প্রয়োজন চাওয়া যায়। এটি দোয়া কবুলের অন্যতম উত্তম সময়।
নামাজের পরের সময়টি দোয়া কবুলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — বিশেষত ফজর ও আসরের পরে।
৭. মোনাজাত (সম্মিলিত দোয়া)
জামাআতে নামাজ শেষে ইমাম সাহেব সাধারণত উভয় হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত পরিচালনা করেন এবং মুক্তাদিরা "আমিন" বলে সম্মতি জানান। একা নামাজ পড়লেও নিজে নিজে এভাবে মোনাজাত করা যায়।
মোনাজাতের নিয়ম
- উভয় হাতের তালু উপরের দিকে রেখে বুক বরাবর তুলুন
- আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে শুরু করা উত্তম
- নিজের, পরিবারের ও সকল মুসলিমের জন্য দোয়া করা যায়
- দোয়া শেষে মুখে হাত মুছে নেওয়া কিছু আলেমের মতে মুস্তাহাব, আবার কিছু আলেম এটিকে হাদিসসম্মত মনে করেন না — উভয় মতই ফিকাহে গ্রহণযোগ্য
- মোনাজাত শেষে "আমিন" বলা সুন্নত
মোনাজাতের একটি সংক্ষিপ্ত নমুনা
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস্-সামীউল আলীম।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে এই ইবাদত কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা: ১২৭)
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রাব্বানা জালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকূনান্না মিনাল খাসিরীন।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সূরা আরাফ: ২৩)
رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়ি লানা মিন আমরিনা রাশাদা।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজে আমাদের জন্য সঠিক পথের ব্যবস্থা করে দিন। (সূরা কাহফ: ১০)
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لَنَا دِينَنَا الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِنَا، وَأَصْلِحْ لَنَا دُنْيَانَا الَّتِي فِيهَا مَعَاشُنَا
আল্লাহুম্মা আসলিহ লানা দীনানাল্লাযী হুয়া ইসমাতু আমরিনা, ওয়া আসলিহ লানা দুনইয়ানাল্লাতী ফীহা মা'আশুনা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের দ্বীন ঠিক করে দিন, যা আমাদের কাজের সুরক্ষা; আর আমাদের দুনিয়া ঠিক করে দিন, যেখানে আমাদের জীবিকা নির্বাহ।
শেষে যোগ করুন: মোনাজাতের শেষে "রাব্বানা আতিনা ফিদ্-দুনইয়া হাসানাহ..." (অধ্যায় ৬-এ দেওয়া দোয়া মাসুরা) পড়ে সবশেষে "আমিন" বলে মুখে হাত বুলিয়ে মোনাজাত শেষ করা যায়।
মনে রাখবেন: মোনাজাত নামাজের অংশ নয় — এটি নামাজ শেষে করা একটি পৃথক, ঐচ্ছিক সুন্নত আমল। কোনো কারণে মোনাজাত ছেড়ে দিলে নামাজে কোনো ত্রুটি হয় না।
দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দোয়া
একজন মুসলিমের প্রতিদিনের জীবনে প্রয়োজনীয় কিছু দোয়া নিচে দেওয়া হলো।
ঘুম থেকে ওঠার দোয়া
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আহইয়ানা বা'দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন্-নুশূর।
অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর (ঘুমের) পর জীবিত করেছেন এবং তাঁরই কাছে পুনরুত্থান হবে।
ঘরে প্রবেশের দোয়া
بِسْمِ اللهِ وَلَجْنَا وَبِسْمِ اللهِ خَرَجْنَا وَعَلَى رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا
বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা ওয়া আলা রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।
অর্থ: আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে বের হলাম এবং আমাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করলাম।
খাবার আগের দোয়া
بِسْمِ اللهِ
বিসমিল্লাহ। (যদি ভুলে যান, মনে পড়লে বলুন: বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহ)
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি।
খাবার পরের দোয়া
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مُسْلِمِينَ
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আত'আমানা ওয়া সাকানা ওয়া জা'আলানা মুসলিমীন।
অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং আমাদের মুসলিম বানিয়েছেন।
ঘরে প্রবেশের সময়
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلِجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাল মাওলিজি ওয়া খাইরাল মাখরাজ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রবেশের কল্যাণ ও বের হওয়ার কল্যাণ চাই।
ঘুমানোর আগের দোয়া
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا
বিইসমিকা আল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মরি এবং বাঁচি।
বিপদের সময়ের দোয়া
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
অর্থ: আমরা আল্লাহরই জন্য এবং আমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী। (যেকোনো বিপদ বা মৃত্যুসংবাদে পড়া হয়)
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ
বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।